একটি মসজিদ উদ্বোধন করার কথা ছিলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে তিনি সেই মসজিদটি ভেঙ্গে এবং পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন!
.
হঠাৎ করে সীরাত পড়তে গিয়ে এই ঘটনা পেলে অবাকই হতে হবে। আল্লাহর রাসূল, যিনি মদীনায় আসার পর প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন, তিনি কিনা একটি মসজিদ ভাঙ্গার নির্দেশ দেন?
কেনো?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মদীনায় অনেকগুলো মসজিদ ছিলো। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- মসজিদে নববী, মসজিদে কুবা, মসজিদে কিবলাতাইন।
মদীনার মুনাফিকরা মসজিদে কুবায় নামাজ পড়তে আপত্তি জানায়। তাদের কথা হলো এই জায়গায় একসময় গাধা রাখা হতো। এখানে নামাজ পড়া যাবে না।
মুনাফিকরা কতোবার কতোভাবে যে রাসূলুল্লাহকে বিরক্ত করে সেটা চিন্তার বাইরে।
তাবুক যুদ্ধের সময় যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধে ফান্ডিংয়ের জন্য আহ্বান করেন, তখন মুনাফিকরা ফান্ডিং তো করলোই না উল্টো তারা সাহাবীদের নিয়ে ঠাট্টা শুরু করলো। যারা বেশি দান করতেন, তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে তারা বললো- ‘অ্যাহ, লোক দেখানোর জন্য দান করছে!’
আর যারা সামর্থ্যের অভাবে কম দান করতেন, তাঁদেরকে বলা শুরু করলো- ‘তোমার এই সামান্য খেজুর দিয়ে কী এমন হবে?’
একদিকে যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যদিকে তারা একটি মসজিদ নির্মাণ করছে। মনে হচ্ছে তারা ভিন্ন একটি প্রজেক্ট করছে, রাসূল যা করছেন সেটা নিয়ে তাদের চিন্তা নেই।
সেই মসজিদটি নির্মাণ হলে উদ্বোধনের জন্য তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ –কে দাওয়াত দেয়। তিনি জানান, তাবুক থেকে ফেরার পর ‘আল্লাহ চাইলে’ তিনি আসবেন।
.
মদীনার এক লোক ছিলো যার নাম আবু আমির। রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনায় আগমনের পূর্বে আবু আমিরের বেশ প্রভাব ছিলো। সে ছিলো একজন স্কলার, নেতা। এজন্য লোকজন তাকে ‘আর-রাহিব’ নামে ডাকতো।
আবু আমির সে রাসূলুল্লাহকে এতো ঘৃণা করে, রাসূলের আগমনের পর সে আর মদীনায় থাকতে চায়নি। সে চলে যায় মক্কায়! মক্কায় গিয়ে সে প্ল্যান করতে থাকে কীভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ –এর ক্ষতি করা যায়।
উহুদ যুদ্ধে সে অংশ নেয় কুরাইশদের পক্ষে। সে ভেবেছিলো মদীনায় তো তার অনেক অনুসারী, যুদ্ধ শুরুর আগে একটা ভাষণ দিলে মদীনার সাহাবীরা তার পক্ষে চলে আসবে। কিন্তু, সে ভাবতে পারেনি মুসলিমদের এই বন্ধন ছিলো ঈমানের বন্ধন। তার ভাষণ শুনে মদীনার লোকজন তাকে ডাকা শুরু করলো- আবু আমির আল-ফাসিক!
আগে যেখানে লোকজন তাকে ডাকতো সন্যাসী, নেককার, এখন তাকে ডাকা শুরু করলো পাপিষ্ঠ।
উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য ছিলেন হানজালা রাদিয়াল্লাহু আনহু। ফেরেশতারা যাকে গোসল করিয়েছিলেন।
আইরনি হলো, হানজালা রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসলিমদের পক্ষে লড়াই করেন আর তার বাবা কুরাইশদের পক্ষে।
তার বাবা ছিলো কে? সেই আবু আমির আল-ফাসিক!
.
আবু আমির এক পর্যায়ে চলে যায় সিরিয়ায়, সে রোমানদের সাথে ডিপ্লোম্যাটিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। আর ধর্মে তো সে ছিলো খ্রিস্টান। ফলে, রোমানরা তাকে বরণ করে। তাদের কাছে আরবের এমন একজন ইন্টেলেকচুয়াল ফিগার পাওয়া ছিলো সৌভাগ্যের।
বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার আলোকে চিন্তা করুন। ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের কথাই ধরুন। পাকিস্তানের কেউ যদি জেনুইনলি ইন্ডিয়াতে যোগ দেয়, ইনফরমেশন শেয়ার করে, তাকে কীভাবে গ্রহণ করা হবে?
রোমানরা আবু আমিরকে এভাবেই গ্রহণ করে।
বর্তমানে আমরা দেখি মার্কিনরা বিভিন্ন দেশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য ঘাটি স্থাপন করে। যেমন: মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, ওমানে মার্কিন ঘাটি আছে।
সুপারপাওয়ার মূলত তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন, নিয়ন্ত্রণের জন্য এভাবেই ঘাটি স্থাপন করে।
তাবুক যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী যায় রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। এর ১ বছর আগ থেকেই মূলত রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের যুদ্ধ শুরু হয়।
রোমানরা এই সময় আবু আমিরকে দিয়ে একটা চাল খেলে। তারা মদীনাতেই তাদের একটা ঘাটি স্থাপন করতে চায়। আর সেটা তো সামরিক ঘাটি হতে পারে না, এজন্য তারা বেছে নেয় রিলিজিয়াস সেন্টার।
সেই উদ্দেশ্যেই আবু আমির তার খালাতো ভাই মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে দিয়ে একটি মসজিদ স্থাপন করতে চায়।
চিন্তা করুন, সিরিয়াতে বসে আবু আমির মদীনা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটা অফিস বানানোর প্ল্যান করে যার উদ্দেশ্য মুসলিমদের ক্ষতি করা।
আর সেটা উদ্বোধনের জন্য কাকে চিফ গেস্ট করতে চায়?
খোদ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে!
.
তাবুক থেকে ফেরার পথে আল্লাহ কুরআনের আয়াত নাযিল করে তাদের এই প্ল্যান জানিয়ে দিলেন। সূরা তাওবার ১০৭-১১০ নাম্বার আয়াতে মসজিদের নামে সামরিক ঘাটি স্থাপনের প্ল্যান ফাঁস হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন এই মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলতে এবং পুড়িয়ে দিতে।
‘মসজিদে দিরার’ নামে পরিচিত এই সামরিক ঘাটি ভেঙ্গে ফেলার মাধ্যমে রোমানদের ষড়যন্ত্র, আবু আমিরের ডিপ্লোম্যাসি ভেস্তে যায়।
.
সীরাত পড়ার সময় আমরা কেবল পড়ি রাসূলুল্লাহ ﷺ মুনাফিকদের মসজিদ ভাঙ্গার নির্দেশ দেন। কিন্তু, এটা যে মসজিদ ছিলো না, এটা ছিলো যে মদীনার বুকে তৎকালীন সুপারপাওয়ারের একটা ঘাটি সেটা আমরা বুঝতে পারি না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পলিটিকাল ডিসিশন যদি আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারতাম, তাহলে সীরাত পড়ে সেটা আমাদের যুগের সাথেও রিলেট করার চেষ্টা করতাম।
১৪০০ বছর আগের সীরাত স্রেফ কোনো গল্প, ঘটনা না। সেটা এই যুগেও প্রাসঙ্গিক।