গান বাজনার বাস্তবতা-
প্রচলিত গান-বাজনার প্রায় ৯০%ই প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ, কামনা, ব্রেকআপ, আকাঙ্ক্ষা এসবকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
দেশপ্রেম, ধর্ম, সভ্যতা, সংস্কৃতি, আদর্শ, আত্মশুদ্ধি, নীতি-নৈতিকতা, মনুষ্যত্ব এসব নিয়ে গান আপনি হাতে গোনা কিছুই পাবেন। আর যেগুলো আছে, সেগুলোও বছর বছর নির্দিষ্ট দিবস বা অনুষ্ঠানে ঘুরে ফিরে বাজানো হয়, তারপর আবার হারিয়ে যায়।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই এসব ধরণের গান কম প্রডিউস হয়, কম প্রোমোট হয়, কম ভাইরাল হয়।
কারণ বর্তমান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি মানুষের চিন্তা জাগাতে চায় না, মানুষকে ভাবুক বানাতে চায় না; বরং মানুষকে ব্যস্ত রাখতে চায়।
একটা সময় পর্যন্ত অন্তত গানের কথার মূল্য ছিল। লিরিক্সে কবিতা ছিল, দর্শন ছিল, বাস্তবতার পর্যবেক্ষণ ছিল, অন্তত কিছু গভীরতা ছিল। এখন খেয়াল করলে দেখবেন, গান থেকে “গান”টাই অনেকাংশে গায়েব হয়ে গেছে, কেবল “সাউন্ড” রয়ে গেছে।
অটো-টিউন, রিপিটেড বিট, হাইপার-স্টিমুলেটিং বেইস, নির্দিষ্ট সাউন্ড প্যাটার্ন এসবের মাধ্যমে মানুষের ব্রেইনকে এক ধরণের সাইকোলজিক্যাল লুপে আটকে রাখা হয়।
আধুনিক সাইকোলজিতে একটা ব্যাপার আছে, “ডোপামিন ড্রিভেন স্টিমুলেশন”। মানুষের মস্তিষ্ক যখন দ্রুত, তীব্র, রিপিটেড স্টিমুলেশন পায়, তখন সেটা ধীরে ধীরে গভীর চিন্তা, নীরবতা, মনোযোগ এসবের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।
বর্তমান মিউজিক কালচার ঠিক এই কাজটাই করছে।
ফলাফল কী?
মানুষ ক্রমেই কম রিফ্লেক্টিভ, কম চিন্তাশীল, কম ধৈর্যশীল হয়ে যাচ্ছে।
সে আর নীরবতায় থাকতে পারেনা। একা থাকলে অস্বস্তি লাগে। পড়তে বসলে মন বসেনা। নামাজে মনোযোগ আসেনা। ৩০ সেকেন্ড পরপর নতুন স্টিমুলেশন লাগে। নতুন বিট লাগে। নতুন রিল লাগে। নতুন সাউন্ড লাগে।
এটা শুধু “বিনোদন” না, এটা এক ধরণের নিউরোলজিক্যাল কন্ডিশনিং।
মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি খুব ভালো করেই জানে কোন ধরণের সাউন্ড, কোন টেম্পো, কোন ফ্রিকোয়েন্সি, কোন ইমোশন মানুষের ব্রেইনে সবচেয়ে বেশি হুক তৈরি করে। তাই তারা এখন আর মূলত “আর্ট” বিক্রি করেনা, তারা মানুষের এটেনশন আর ইমোশন ম্যানিপুলেট করে।
খেয়াল করলে দেখবেন, আজকের জনপ্রিয় গানের বড় একটা অংশ মানুষকে হয় কৃত্রিম রোমান্টিসিজমে ডুবিয়ে রাখে, না হয় হতাশা, কামনা, পার্টি কালচার, বিদ্রোহ, মদ-মাদক, শরীরপূজা বা হেডোনিজমের দিকে ঠেলে দেয়।
একজন মানুষ যদি দিনের পর দিন এমন কন্টেন্ট কনজিউম করে, তাহলে তার চিন্তা-চেতনা, আবেগ, এমনকি বাস্তবতাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে।
কারণ মানুষ কেবল খাবার দিয়েই বাঁচে না, মানুষ “কনটেন্ট” দিয়েও বাঁচে। আপনি প্রতিদিন যা শুনছেন, যা দেখছেন, যেসব শব্দ আপনার হৃদয়ে ঢুকছে, সেগুলো ধীরে ধীরে আপনার অন্তরকে গঠন করছে।
এই কারণেই দেখা যায়, গান-বাজনার জগতে ডুবে থাকা বহু মানুষের জীবন একসময় ঘুরপাক খায় নেশা, অবৈধ সম্পর্ক, মানসিক শূন্যতা, বিষণ্ণতা, আত্মবিধ্বংসী জীবনযাপন আর অর্থহীনতার মাঝে।
অবশ্যই সব শ্রোতা বা শিল্পী একই রকম না। ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু সামগ্রিক ইন্ডাস্ট্রির দিকনির্দেশনা কোনদিকে, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ খুব কম।
আর ইসলাম ঠিক এখানেই মানুষের হৃদয়কে রক্ষা করতে চায়।
ইসলাম মানুষের ফিতরাতকে বোঝে। জানে, মানুষের হৃদয় খুব সহজেই প্রভাবিত হয়। তাই ইসলাম শুধু “কী করছো” সেটা দেখে না, বরং “কী শুনছো, কী দেখছো, কী দ্বারা হৃদয় ভরাচ্ছো” সেটাকেও গুরুত্ব দেয়।
কারণ হৃদয় যদি ক্রমাগত কামনা, বিভ্রম, গাফেলতি আর মিথ্যা আবেগে ভরে যায়, তাহলে সেখানে কুরআনের নূর, আল্লাহর স্মরণ, আখিরাতের চিন্তা, আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা এসবের জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে।
এজন্যই ইসলামে এমন বিনোদনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে, প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়, বা অন্তরকে অসাড় বানিয়ে ফেলে।
একটা হৃদয় একই সাথে দুই জিনিসে পূর্ণ হতে পারেনা। হয় সেটা আল্লাহর স্মরণে জীবন্ত হবে, না হয় অবিরাম স্টিমুলেশন আর নফসের শব্দে ভারী হয়ে যাবে।
- মাহফুজ আল-আমিন (
https://www.facebook.com/share/1BGTC1TpTN/)