১।
“বৌমা তো সারাদিন পোড়া মরিচ খায়!
ও বাজান, মসজিদ থেকে আসার সময় বড় হুজুরের কাছ থেকে পানি পড়া নিয়ে আসিস।
জ্বিন আসর করল নাকি—কে জানে!”
২।
"ও বৌ শুনো...পোয়াতি মাইনষের একটু কম খাইতে হয়। বেশি খাইলে বাচ্চা বড় হইয়া যাইব। তখন বাচ্চা হওনের সময় তোমারই কষ্ট হইব।
আর ভুলেও বাড়ির পেছনে গাছতলায় যাইয়ো না। কখন কিসের নজর লাগে!
৩।
"শুনেন ভাবি... আপনার ছেলের বউয়ের মনে হয় খারাপ বাতাস লাগছে। দেখেন না, সারাদিন বমি করে! কিচ্ছু খাইতে পারে না!
হুজুরের কাছে থেকে তাবিজ আইন্যা কোমরে বাইন্ধা দিয়েন,
খারাপ বাতাস কই চইল্যা যাইব"
ছোট বেলায় এমন কত শত ঘটনা দেখেছি, শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই! গর্ভবতী নারীর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে অনেকেই অস্বাভাবিক, রহস্যময় কিংবা কুসংস্কারের চোখে দেখতেন। অথচ গর্ভকালীন সময়ে হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে খাবারের রুচি বদলে যাওয়া, বমি হওয়া, অরুচি, টক-ঝাল-মিষ্টির প্রতি আকর্ষণ—এসব খুবই স্বাভাবিক বিষয়।
কিন্তু আগেকার দিনে এসব না বুঝে অনেক হবু মাকে অকারণে নানা কথা শুনতে হতো। পরিবারের অসচেতনতা ও সমাজের কুসংস্কার তাদের জীবনের সুন্দর সময়টাকে অনেক ক্ষেত্রেই কষ্টকর করে তুলত!
আলহামদুলিল্লাহ, এখন মানুষ অনেক বেশি সচেতন হচ্ছে। প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে আমরা বুঝতে পারছি—গর্ভকালীন সময় কোনো অসুস্থতা নয়; এটি একজন নারীর জীবনের অত্যন্ত বিশেষ, সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তাই পরিবার, আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীর কারও গর্ভধারণের খবর জানলে প্রথমেই তাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তার এবং অনাগত সন্তানের সুস্থতার জন্য দোয়া করুন। সময়ে সময়ে খোঁজ নিন, কারণ এই সময়ে একজন হবু মা একটু বেশি যত্ন, সহানুভূতি ও মানসিক সমর্থন আশা করেন। এছাড়াও কাছের মানুষরা গর্ভবতী মায়ের জন্য যেসব ছোট ছোট উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন।
১. ড্রাই ফ্রুটস ও খেজুর:
প্রথম তিন মাস অনেক হবু মা বমি বা অরুচির কারণে ঠিকমতো খেতে পারেন না। এ সময় বাদাম, ড্রাই ফ্রুটস ও খেজুর পুষ্টির ভালো উৎস হতে পারে। তাই গিফটের তালিকায় এই দুটো জিনিস প্রথম পছন্দ হতে পারে।
২. আচার:
অনেকেরই এই সময় টক খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। আম, জলপাই, তেতুল, চালতা, বড়ই বা রসুনের আচার তৈরি করে উপহার দেওয়া যায়, অথবা ভালো মানের আচার কিনেও দেওয়া যায়। ইদানিং অনলাইনে বেশ কিছু বিশ্বস্ত পেজে ভালো মানের আচার পাওয়া যায়।
৩. বিভিন্ন ধরনের ভর্তা:
বেশিরভাগ হবু মা ঝাল খাবার পছন্দ করেন। তাই মাঝে মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ভর্তা বানিয়ে খাওয়ানো যায়। প্রতিবেশী হলে কয়েক রকমের ভর্তা তৈরি করে দিলেও সুন্নাহ পালনের সাওয়াব মিলবে।
৪. মিষ্টি আইটেম:
কিছু কিছু হবু মায়ের মিষ্টি খাবারের প্রতি আগ্রহ জন্মে। তাদের জন্য ঘরে তৈরি ফিরনি, পায়েস, সেমাই, মিষ্টি পিঠা বানিয়ে দেওয়া যায়।
৫। বালাচাও বা মাংসের আচার:
ইদানিং বালাচাও ও গরুর মাংসের আচার বেশ জনপ্রিয় একটি খাবারে পরিণত হয়েছে। বালাচাও ঘরে থাকলে হুটহাট একটু পেঁয়াজ, মরিচ মেখে দ্রুত ভর্তা করে খাওয়া যায়। বিশেষ করে যেসব হবু মায়েরা একা থাকেন, তাদের জন্য এই দুটো জিনিস উপহারের তালিকায় রাখা যেতে পারে।
৬। ঢিলেঢালা পোশাক:
গর্ভকালীন সময়ে মেক্সি, গোল জামা অথবা গাউন এর মত পোশাক নারীদের বিশেষ পছন্দের তালিকায় থাকে। আরামদায়ক পাতলা কাপড়ের মেক্সি বা গাউন হবু মায়ের জন্য অন্যতম উপহার হতে পারে।
অনেক সময় হবু মা নিজের চাহিদার কথা বলতে সংকোচবোধ করেন। এখনও অনেক পরিবারে মুখ ফোটে বলা তো দূরের কথা হবু মা নিজের পছন্দমত খাবারও খেতে পারে না! হাতে কিছু টাকা থাকলে নিজের পছন্দের খাবার বা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারেন। তাই অর্থ উপহারও হতে পারে খুব বাস্তবসম্মত ও সহায়ক একটি উদ্যোগ।
সবচেয়ে বড় কথা—উপহারই সব নয়। গর্ভকালীন সময় প্রতিটি নারীর জীবনে এক বিশেষ অধ্যায়। এই সময়ে একজন নারীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালোবাসা, সম্মান, মানসিক শান্তি ও সহানুভূতি। এ সময়ের আনন্দ, কষ্ট, আশা, ভয়—সবকিছুই তার হৃদয়ে গেঁথে থাকে আজীবন। তাই কোনো কষ্টদায়ক মন্তব্য নয়, বরং তাকে ভালোবাসায় আগলে রাখুন। আপনার একটি সুন্দর কথা, সামান্য যত্ন কিংবা আন্তরিক খোঁজখবরও তার এই যাত্রাকে অনেক বেশি সহজ ও সুন্দর করে তুলতে পারে।
শেফাত-ই-সুলতানা
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ১