কোরআনে একটা আয়াত যখনই পড়ি তখনই আমি আত্নবিশ্বাসী হই।
আল্লাহ বলেছেন — "নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে।" (সূরা ত্বীন, ৯৫:৪)
"সর্বোত্তম" মানে এর ওপরে আর কিছু নেই। অথচ আমরা নিজেদের চেহারা বা অবয়ব নিয়ে সবচেয়ে অসন্তুষ্ট জাতি হয়ে উঠছি।
একটা প্রশ্ন করি।
যখন আয়না ছিল না, তখন মানুষ কী করত?
হাজার হাজার বছর মানুষ নিজের মুখ ঠিকমতো দেখতেই পেত না। পানির প্রতিফলন, নয়তো ধাতুর পালিশ করা টুকরো — এতটুকুই। মানুষ তখন বাঁচত নিজের চেহারা নিয়ে না ভেবে।
তারপর এলো আয়না। মানুষ প্রথমবার স্পষ্ট করে নিজেকে দেখল। আর দেখা শুরু করতেই — নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। কীভাবে আরও সুন্দর হওয়া যায়, কীভাবে এই দাগটা ঢাকা যায়, কীভাবে ওকে টেক্কা দেওয়া যায় — চিন্তাটা এখান থেকেই শুরু।
প্রথমে এলো মেকআপ। যা আছে, তার ওপর রং চাপিয়ে দেওয়া। আসল মুখটা ঢেকে একটা "উন্নত" মুখ দেখানো।
তারপর এলো ফিল্টার। মেকআপেরও ডিজিটাল সংস্করণ — এক ট্যাপে ত্বক মসৃণ, নাক সরু, চোখ বড়, রং ফর্সা।
কী অদ্ভুত যাত্রা, খেয়াল করেছেন? আয়না বানানো হয়েছিল সত্য দেখতে। কিন্তু সেই সত্যটা আমাদের এত অপছন্দ হলো যে আমরা এমন জিনিস বানালাম, যা মিথ্যে বলে।
ভয়ংকর বিষয় হল, এটা এখন আর রং বা ফিল্টারে থেমে নেই।
পশ্চিমে নিজের চেহারা পরিবর্তন করা মহামারির রূপ নিয়েছে। ঠোঁটে জেল ভরানো, চোয়াল কেটে ছোট করা, নাকের আকার বদলানো, চামড়া সাদা করার ইনজেকশন, নিজেকে জীবন্ত পুতুল বানানো। মানুষ ছুরির নিচে শুয়ে পড়ছে — একটা কাল্পনিক "নিখুঁত" মুখের জন্য।
না, নিজেদের ভালো ভাবার প্রয়োজন নেই। এটা এখন শুধু ওদের সমস্যা না
ঢাকাতেই এখন সারি সারি ক্লিনিক। ঠোঁটে ফিলার, মুখের আকার বদলানো, ফর্সা হওয়ার ইনজেকশন — সবই এখন হাতের নাগালে, বিজ্ঞাপনসহ। আমাদের ঘরেও ঢুকে গেছে।
কেন হচ্ছে এমন?
কারণ ছোটবেলা থেকে আমাদের সুন্দর হওয়ার ছাঁচ গিলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভেবে দেখুন — নাটক-সিনেমার নায়ক কি কখনো কালো হয়? বোঁচা নাক? শুকনো? হয় না। নায়িকাও না। ইন্ডাস্ট্রি একটা "সুন্দর"-এর সংজ্ঞা বানিয়ে রেখেছে — ফর্সা, লম্বা, নিখুঁত।
আর গত পঁচিশ-তিরিশ বছর ধরে আমরা ওই একটা বিজ্ঞাপনই তো দেখে আসছি — "ফর্সা হও, তবেই সুন্দর।" সাবান থেকে ক্রিম, শ্যাম্পু থেকে সিনেমা — গোটা ইন্ডাস্ট্রি মিলে একটা ছাঁচ বানিয়েছে।
তারপর কেউ সেই ছাঁচে খাপ না খেলে নিজেকে কুৎসিত ভাবে। আর তখনই ছোটে মেকআপে, ফিল্টারে, ক্লিনিকে, সার্জারীতে।
অথচ ছাঁচটাই তো মিথ্যে।
এবার আসল কথাটা শুনুন।
আল্লাহর একটা সুন্দর নাম আছে — আল-মুসাওয়্যির। অর্থ: যিনি রূপদান করেন, আকৃতি দেন। যিনি প্রতিটা মুখ আলাদা করে, নিজ হাতে, নিখুঁতভাবে গড়েন।
মায়ের গর্ভে আপনার চোখ কোথায় বসবে, নাক কেমন হবে, ঠোঁটের বাঁক কতটা — প্রতিটা সিদ্ধান্ত তাঁর। কোটি কোটি মানুষ, অথচ একটা মুখও আরেকটার মতো না। এই বৈচিত্র্যটাই তো তাঁর শিল্পের প্রমাণ।
এখন ভাবুন। যে মুখটা আল-মুসাওয়্যির নিজ হাতে গড়েছেন, সেটাকে "অসুন্দর" বলে ঢেকে ফেলা, কেটে বদলানো — এটা আসলে কার সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা?
আপনার এই চেহারাটাই — যেটা নিয়ে আপনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আফসোস করেন — এটাই আপনার স্রষ্টার হাতে গড়া সেরা মাস্টারপিস। আপনার গায়ের রং, আপনার নাকের গড়ন, আপনার উচ্চতা — কোনোটাই ভুল না। এগুলো একজন মহাশিল্পীর সিদ্ধান্ত। আর তাঁর সিদ্ধান্তে ভুল থাকে না।
টিভির হিরো আপনার সৌন্দর্যের সংজ্ঞা ঠিক করে না।
সৌন্দর্যের সংজ্ঞাটা আসমান থেকে লেখা হয়ে এসেছে — "সর্বোত্তম গঠনে"।
মেকআপ মুছে যায়। ফিল্টার সরে যায়। সার্জারির দাগ থেকে যায়। কিন্তু তিনি যে রূপ দিয়েছেন, সেটাই আসল, সেটাই স্থায়ী, সেটাই সুন্দর।
আল্লাহ আমাদের নিজেদের রূপে সন্তুষ্ট থাকার, আর তাঁর সৃষ্টিকে সম্মান করার তাওফিক দিন।
আমীন। 🤍
- সংগৃহীত