আগে আমাদের দাদী-নানীদের আমলে প্রসব খুব সহজ ছিল। একেক জনের দশ-বারো জন বা আরও বেশি ছেলেমেয়ে হত। বেশিরভাগ প্রসব প্রাকৃতিকভাবে বাসাতেই হত, এবং দেখা যেত তারা খুব সহজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গিয়েছেন। তাদের কোনো ওষুধ বা চিকিৎসক লাগত না, আর এইসব প্রিনেটাল কোর্স বা পড়াশোনার তো প্রশ্নই আসে না!
বিষয়টি যতটা সহজ মনে হয়, আসলে কি তাই?
আসুন, আপনাকে অন্য একটা প্রশ্ন করি—আপনি কি সাঁতার কাটতে জানেন?
গ্রামে বড় হওয়া কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তিনি সাঁতার জানেন কিনা—অধিকাংশ ক্ষেত্রে উত্তর হবে “হ্যাঁ”। কিন্তু তিনি কিভাবে শিখেছেন, সেটা অনেক সময় মনে করতে পারবেন না। ছোটবেলায় সবার সাথে পুকুর, নদী বা বিলে গোসল করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই শিখেছেন। সাঁতার শেখা তাদের জন্য আলাদা কোনো দক্ষতা ছিল না—জীবনের অংশ হিসেবেই, তেমন কষ্ট ছাড়াই শিখে ফেলেছেন।
অন্যদিকে, এই শহরে ছোট থেকে বেড়ে ওঠা আমি বা আপনি হয়তো সাঁতার জানি না। শিখতে চাইলে সুইমিং পুলের অল্প পানিতেও ভয় লাগতে পারে। আত্মবিশ্বাস কম থাকে এবং ট্রেইনারের পাশাপাশি মনোযোগ দিয়ে অনুশীলনের প্রয়োজন হয়। কারণ আমাদের বেড়ে ওঠার সময় পানির সাথে সেই সহজ সম্পর্ক ছিল না।
প্রসবের বিষয়টিও সমাজে এমন হয়ে গেছে। দাদী-নানীদের সময় তারা ছোটবেলা থেকেই প্রসবের সাথে পরিচিত ছিল। নিজের ঘরে, আত্মীয়স্বজন এমনকি গৃহপালিত পশুদের প্রসবও তারা কাছ থেকে দেখেছে। এগুলো তাদের দৈনন্দিন জীবন ও আলোচনার অংশ ছিল। এজন্য প্রসব তাদের কাছে ভয়ের কিছু ছিল না। পাশাপাশি, প্রসবের অন্য কোনো বিকল্পও ছিল না। জীবনযাপন ও কাজকর্মের কারণে তারা শারীরিকভাবেও সুস্থ ও সক্রিয় ছিল। এভাবে শরীর ও মন স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রস্তুত থাকত।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—তখনও জটিলতা ছিল। একটু খোঁজ নিলে দেখা যাবে, আপনার দাদী বা নানীর হয়তো সব সন্তান বেঁচে নেই, কিংবা তাদের কোনো বোন বা আত্মীয় প্রসবের সময় মারা গিয়েছেন।
বর্তমানে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। এখন আগে থেকেই অনেক জটিল বিষয় জানা যায়, সতর্কতা অবলম্বন করা যায় এবং প্রয়োজনে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে মা ও শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। এটি নিঃসন্দেহে আল্লাহর অশেষ নিয়ামত। তবে আমাদের সমাজে একটি নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে—স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে ভয় এবং অজ্ঞতা।
শহরকেন্দ্রিক একক জীবনে আমরা আগের মতো প্রসবকে কাছ থেকে দেখি না। এ বিষয়ে তেমন আলোচনা হয় না। অনেক সময় দেখা যায়, একজন মেয়ে কোনো পূর্বজ্ঞান ছাড়াই নিজের প্রথম প্রসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। আমাদের জীবনযাপনও আগের মতো সক্রিয় নয়, ভেজালের ভিড়ে শারীরিক সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রস্তুত থাকি না। এজন্য ভয় সহজেই মনে জায়গা করে নেয়।
পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে রয়েছে সি সেকশন। এখন প্রশ্ন হতে পারে—যেহেতু সি সেকশনে মা ও শিশুর জীবন বাঁচানো যায়, তাহলে সমস্যা কোথায়? কিন্তু মনে রাখতে হবে, এটি একটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার, যেখানে পেটের একাধিক স্তর কেটে শিশুকে বের করে এনে পুনরায় সেলাই করা হয়। তাই এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয় এবং এর কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতেই পারে, যেগুলো অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
দুঃখজনকভাবে, প্রয়োজনের বাইরে সি সেকশনের হার বেড়ে যাওয়ায় মাতৃস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ কারণেই দেশের অভিজ্ঞ গাইনি বিশেষজ্ঞরাও অপ্রয়োজনীয় সি সেকশন কমানোর কথা বলছেন।
সবশেষে বাস্তবতা হলো—আমরা অনেকেই স্বাভাবিক প্রসব চাই, কিন্তু সেই অনুযায়ী শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি নেই না।
সময়ের প্রয়োজন এখন সচেতনতা। যেমন সাঁতার শিখতে গেলে ট্রেইনার ও অনুশীলন লাগে, তেমনি প্রাকৃতিক প্রসবের জন্য সঠিক প্রস্তুতি, সঠিক তথ্য এবং মানসিক শক্তি প্রয়োজন। এটি কঠিন কিছু নয়—আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের শরীরকে এভাবেই তৈরি করেছেন। কিন্তু প্রস্তুতি ছাড়া এটি খুব সহজও নয়।
এখন আসা যাক—প্রিনেটাল কোর্স বা প্রসব বিষয়ক পড়াশোনা থেকে আমরা আসলে কী শিখি।
প্রথমত, গর্ভাবস্থায় সঠিক পুষ্টি ও জীবনযাপন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। কী ধরনের খাবার খাওয়া উচিত, কোন পুষ্টি উপাদান বেশি প্রয়োজন, কখন ও কীভাবে সাপ্লিমেন্ট নিতে হবে—এসব বিষয় বোঝানো হয়। পাশাপাশি উপযুক্ত এক্সারসাইজ ও মুভমেন্টের মাধ্যমে কীভাবে শরীরকে প্রসবের জন্য প্রস্তুত রাখা যায়, সেটাও শেখানো হয়।
দ্বিতীয়ত, প্রসব প্রক্রিয়াকে সহজ ও বাস্তবভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে অজানা ভয় দূর হয়। প্রসব কীভাবে ধাপে ধাপে এগোয়, কোন স্টেজে কী ঘটে, ব্যথা কমানোর প্রাকৃতিক ও কার্যকর উপায় কী, এবং সেই সময় কী ধরনের সাপোর্ট প্রয়োজন—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়। একই সাথে কোন লক্ষণগুলো স্বাভাবিক আর কোনগুলো সতর্কতার, সেটাও জানা যায়। আপনার সি সেকশন আসলে প্রয়োজন কিনা, যাচাই বাছাই করে নিজে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন ইন শা আল্লাহ।