নতুন মায়েদের অভিজ্ঞতা একেকজনের জন্য একেকরকম হয়। কেউ হয়তো আমার মতো এই অনুভূতির ভেতর দিয়ে যায়নি, কেউ হয়তো একেবারেই ভিন্নভাবে সামলেছে। আমি কেবল আমার অনুভূতিটুকু শেয়ার করলাম, যেটা আমি সেই সকালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছিলাম। এটা কোনো টিপস না, কোনো সল্যুশনও না, শুধু আমার জীবনের একটা ছোট্ট কিন্তু প্রয়োজনীয় বদল।
খুব সাধারণ একটা সকাল, অথচ আমার ভিতরটা যেন ভেঙে পড়ছিল। আমার হোম ডেকোর করা হয়নি। দেয়ালে কিছু নেই, তেমন কোনো শোপিস নেই, বিছানার উপরে বাড়তি কুশন নেই। শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
কিন্তু সেই অল্প জিনিসগুলোও কোথায় থাকবে, কীভাবে থাকবে, তা নিয়ে আমি খুব নির্দিষ্ট ছিলাম, moderate OCD বলা যায়। ওয়াইপস কোন দিকে মুখ করে থাকবে, স্লিপ সেটআপে লাইট কেমন পড়বে, কোন বোতলটা কোথায় থাকলে হাতের নাগালে থাকবে, এসব নিয়েই আমার মনে একধরনের ম্যাপ ছিল। কেউ কিছু সরিয়ে রাখলে আমার ভেতরে অস্থিরতা কাজ করত, ঠিক না করা পর্যন্ত ঘুমাতে পারতাম না।
প্রথম সন্তান হওয়ার পর প্রথম কয়েকটা দিন আমি যেন নিজের ছায়া হয়ে গিয়েছিলাম। বেবি ব্লুস ছিলো। ঘুম নেই, খাওয়ার সময় নেই, মাথা কাজ করছে না, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, শরীর ব্যাথা করছে। তার মাঝেও আমি খুঁজছিলাম আমার ম্যাপটা। কোনটা কোথায়, পরিচিত সব জিনিস অপরিচিত জায়গায় কেন? এসব ভেবে আমার মাথার ভেতর একটা গুঞ্জন চলছিল সব সময়।
অষ্টম দিনের সকালটা আমার জন্য অন্যরকম ছিল। ঘুম ভেঙে রুম থেকে বেরিয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখি, টেবিলে শুকিয়ে যাওয়া প্লেট, খাটের নিচে আধখোলা ডায়াপার ব্যাগ, সোফার পাশে গাদা করে রাখা জামাকাপড়, ওয়াইপ এর বক্স খোলা। সবকিছু যেন একসাথে চেঁচিয়ে উঠছে।
আমি শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে রইলাম পাক্কা ৫-৬ মিনিট। চুপচাপ। চোখে পানি আসছিল, কিন্তু আমি কাঁদছিলাম না। মনে মনে ভাবছিলাম, আমি যদি এখন এই ঘর গুছাতে বসি, আমি ভেঙে পড়ব।
সেই মুহূর্তে, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি আমার ঘরে ফিরে গেলাম। মনটা সম্পূর্ণভাবে ঘরের বাইরে রাখা অগোছালো জিনিসপত্র থেকে সরিয়ে আনলাম। সেদিন আর রুম থেকে তেমন বের হইনি, কিছুই গুছালাম না। সব কিছু যেমন ছিল, তেমনই পড়ে থাকল। টিস্যু শুকিয়ে গেল, জামা পড়ে থাকল, আমি দেখলাম, কিন্তু ছুঁইনি।
আমি শুধু খেয়েছি, খাইয়েছি, ঘুমিয়েছি, আর আমার সন্তানের পাশে থেকেছি। আমি শুধু নিজেকে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি, জিনিসপত্রগুলোকে না। আগে কখনো এটা করিনি। আমি সবসময় কাজ আগে করতাম, তারপর বিশ্রাম। সব কিছু জায়গামতো না থাকলে আমি শান্তি পেতাম না।
কিন্তু ওই দিন আমি বুঝলাম আল্লাহ আমাকে যেই আমানাত দিয়েছেন তার এখন দরকার একটা সুস্থ, স্নেহময় মা। নিখুঁত ঘর না। আর আমার দরকার কিছু এলোমেলোকে মেনে নেওয়া, যেন সুস্থ থাকতে পারি।
পরদিন গোসল করলাম। তারপর ঘরটা একটু গুছালাম, কিছু কাপড় ভাঁজ করে রাখলাম, খাট ঝাড়লাম, আরো কিছু কাজ করলাম। সব মিলিয়ে ৫০ মিনিট লেগেছিলো। ঘরটা ম্যাজিকের মতো পরিষ্কার হয়নি। কিন্তু আমার ভেতরটা হালকা লাগছিল। মনে হচ্ছিল আমি আবার একটু করে গোছাতে পারছি নিজেকে।
বাবু এখন বড় হয়েছে, এখন বাসা মোটামোটি গুছিয়ে রাখতে পারি। এখনো চাই সবকিছু এমন জায়গায় থাকুক যেন চোখ বন্ধ করেও হাতে পাই। এটা নরমাল না, আমি জানি। তবে এখন আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে শিখেছি, "এই জিনিসটা কি এখনই করা দরকার? নাকি এটা আমার পুরনো অভ্যাস?" প্রায়ই উত্তর আসে "না"। তখন আমি সেটা ছেড়ে দিই। নিঃশ্বাস নেই। নিজেকে বলি, “পরে করা যাবে।”
আমি জানি, আমার ঘরের মতো আমার মনের অবস্থাও রকম ফের হবে। মাঝে মাঝে এলোমেলো, মাঝে মাঝে গোছানো, এই দুইটার মাঝেই একটা ভারসাম্য গড়ে তুলেছি। আমার মাথার সেই ম্যাপটা এখনো আছে। কিন্তু এখন আমি বুঝি, দরকার হলে সেটা একটু ছিঁড়ে ফেললেও ক্ষতি নেই। আমি হারাব না।
✍🏻 ফারিসা তাজরী আহমেদ
দৌলা ইন্টার্ন, রৌদ্রময়ী স্কুল