– মিসর, সৌদি আরব, ইরাক, জর্ডান, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো বিভিন্ন অঞ্চলে যখন মুসলিমদের উপর স্বৈরশাসকদের জুলুম নির্যাতন চলছিল, তখন এই সরকারগুলোর অবস্থান মজবুত করতে তাদেরকে সমর্থন দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই বছরগুলিতেও ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ঘটেনি। উদাহরণ স্বরূপ, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিশরে আনোয়ার সাদাত এবং হোসনি মুবারকের মতো স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন ১৯৭০ থেকে ২০০০ এর দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছিল, ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা তখনও অনেক বছর দূরে ছিল।
এই অঞ্চলগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুসলমানদেরকে বন্দী, নির্যাতন, হত্যা, নির্বাসন এবং তাদের সাথে অকল্পনীয় আচরণ করার ক্ষেত্রে এই শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন ও শক্তি জুগিয়েছিল। ১১ সেপ্টেম্বরের অভিযান যারা পরিচালনা করেছিলেন, তারা তখনও জন্মগ্রহণ করেনি।
– মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ৯০-এর দশকে বসনিয়ায় মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকদের বিরুদ্ধে অপহরণ, মৃত্যুদণ্ড, নির্বাসন এবং বন্দী করার মিশন চালিয়েছে, ১১ সেপ্টেম্বর কোন অস্তিত্ব তখন ছিল না।
সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলি ১৯৯৩ সাল থেকেও অনেক বছর দূরে ছিল, যখন আমেরিকান সৈন্যরা সোমালিয়ায় প্রবেশ করেছিল, হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করেছিল এবং তারপর অপমানিত হয়ে পালিয়েও গিয়েছিল।
– যখন একই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৬-এর পর আফগানিস্তান সরকারের সর্বোচ্চ নেতা ও এর কর্মকর্তাদের অবস্থানে বোমাবর্ষণ করছিল, বিদ্রোহীদের সহায়তা করছিল, এবং ১৯৯০-এর দশকে ইরাকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বোমাবর্ষণ করে লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষুধায় ও রোগে ভুগিয়ে হত্যা করছিল, ১১ সেপ্টেম্বর তখনও ঘটেনি।
– যদি আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমের বাইরে আরেকটু বিস্তৃত হই… তাহলে দেখা যাবে, ইংল্যান্ড আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে, ফ্রান্স আলজেরিয়া এবং আফ্রিকার বাকি অংশে, রাশিয়া ককেশাসে এবং পূর্ব তুর্কিস্তানে চীন মুসলমানদের প্রতি শত্রুতা ও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তখনও কোন ‘১১ সেপ্টেম্বর’ ছিল না।
এই উদাহরণগুলোর তালিকা আরও দীর্ঘায়িত করার সুযোগ ছিল। তবে এই পর্যন্ত আমাদের আলোচনার ব্যাখ্যায় যে দৃষ্টান্তগুলো এসেছে, আশা করা যায় সেগুলো সচেতন মুসলিম ও বিবেকবান বিশ্ববাসির উপর থেকে মার্কিন প্রোপ্যাগান্ডার প্রভাব দূর করতে যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ্।
সংক্ষেপে, ইসলামি বিশ্ব ও মুসলমানদের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং ইসলামের অন্যান্য শত্রুদের বিদ্বেষের কারণ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ছিল না। এই বিদ্বেষ হক্কের প্রতি বাতিলের চিরায়ত বিদ্বেষ, এই বিদ্বেষ রব্বে কারিম প্রদত্ত আসমানি মতবাদের প্রতি মনগড়া কল্পনাপ্রসূত মতবাদের বিদ্বেষ।
ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসীদের এই শত্রুতা পরিচালিত হয়ে আসছে ১১ সেপ্টেম্বরের বহু শতাব্দী আগে থেকেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার প্রক্সিরা, যারা ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার আগে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংস বৈরিতা প্রদর্শন করেছিল এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল, তারা ৯/১১ না ঘটলেও এটি চালিয়ে যেত, বরং এটি আরও গভীর পৌঁছাতো।
১১ই সেপ্টেম্বরের আগে আমেরিকার বিদ্বেষ, আগ্রাসন ও শত্রুতা ১১ সেপ্টেম্বরের পরের ঘৃণা, আগ্রাসন ও শত্রুতার চেয়ে কম ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, ইরাকের বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালে শুরু হওয়া নিষেধাজ্ঞার কারণে লক্ষ লক্ষ ইরাকি রোগ ও অপুষ্টিতে মারা গিয়েছিল। বিশ্ব এর আগে কখনও এমন নিষেধাজ্ঞা দেখেনি। ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার মাঝে এটি মাত্র একটি উদাহরণ।
যদি আমরা ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে ১১ সেপ্টেম্বরের ভূমিকা মূল্যায়ন করি, তবে আমরা এই ঘটনাকে ১০৭১-এর মানজিকার্ট, ১১৮৭-এর জেরুজালেম বিজয়, ১৪৫৩-তে ইস্তাম্বুল বিজয়ের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর সাথে তুলনা করতে পারি। কেননা এর প্রত্যাকটিই মানব ইতিহাসে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছে, জালিমদের বিরুদ্ধে নিপিড়ীত জনতাকে ঘুরে দাঁড়াবার সাহস জুগিয়েছে। হারানো ভূমি পুনরুদ্ধারে ঘুমন্ত শার্দূলদের জাগ্রত করেছে। মুসলিমদেরকে কাফেরদের প্রতিটি ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া জানানোর হিম্মত জুগিয়েছে। পরিশেষে, বিশ্বপরাশক্তির লেবাসধারী জালেমদের কবর খুঁড়েছে।
সুতরাং, গ্লোবাল নর্থ, ওয়েস্টার্ন ব্লক, ক্রুসেডার ওয়ার্ল্ড বা পশ্চিম ইউরোপ… আমরা যে নামেই বলি না কেন, ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিশ্বের এই শক্তিগুলোর মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক যুদ্ধ ১০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে। তাই এটি বলা ঠিক হবে না যে, ইসলামি বিশ্বের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসনের ইতিহাস ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১-এ শুরু হয়েছে, কিংবা ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার কারণে মুসলিমরা আজ বিশ্বব্যাপি করুণ পরিণতি বরণ করছে। বরং, এটা তো ছিল মুসলিমদের বেহাল দশার শেষের শুরু, রাতের গভীর অমানিসার শেষপ্রান্তে দিগন্ত চিঁরে উন্মেষ ঘটা এক চিলতে আলো।
মানবতার দুশমনদের জুলুমের প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে উঠার গোঙানি-আস্ফালন আর আমাদের ভীত না করুক।