কৃতজ্ঞতা, Starts From Here...(পর্বঃ ০৩)
মাঝে মাঝে ভাবি একটা কম্পিউটার থাকলে পুরা কুপাই ফেলতাম। লেকচার, ইসলামি বই, সাইট ঘেটে ঘেটে একেবারে শায়খ হয়ে যেতাম। আলহামদুলিল্লাহ্, আল্লাহ আমার জন্য এটাই চেয়েছেন। কম্পিউটার থাকলে হয়ত দ্বীন থেকে বিচ্যুত হতাম। জাহিলিয়াতে ডুবে যেতাম। হলে উঠে গণরুমে থাকতাম। কি কষ্ট!! ঘুমানোর কষ্ট। ভালো করে পিটটা রাখার ও জায়গা নেই। আলহামদুলিল্লাহ্ আল্লাহ আমার জন্য এটাই চেয়েছেন। আমার চারপাশের বন্ধুগুলো জাহিলিয়াতে ডুবে আছে, তাদের মত নই বলে আমি গোঁড়া, অনেকের কাছে আনস্মার্ট, গায়ে এক তোলা মাংশ নেই, দেখতে ভালো নই, চারপাশে তিন চারটা মেয়ে নিয়ে ক্যাম্পাসে হাঁটতে পারিনা। আলহামদুলিল্লাহ্ আল্লাহ আমার জন্য এটাই ফয়সালা করেছেন। আমি স্বপ্ন দেখতে পারি, আমি চিন্তা করতে পারি, কোনটা ভালো কোনটা খারাপ বুঝতে পারি, আবেগের বশে ভুলটা করে ফেললে ক্ষমা চাইতে পারি। আলহামদুলিল্লাহ্, সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর।
আমরা আমাদের বাবা মায়েদের কাছে কৃতজ্ঞ। সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। সেই বিষয়টা এখানে নয় অন্য কোন দিন আলাদা একটা লেখায় লিখব ইনশাআল্লাহ।
আমার এক ফুফাত ভাই ডাক্তার। আমাদের আত্মীয় স্বজনদের সাথে আমাদের খুব একটা যাওয়া আসা নেই। কেবল কোন কারণ দেখা দিলেই যাওয়া আসা হয়। আর আমার ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত। আমার তো মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় আমরা যে দুই ভাই এক বোন এটা আমার সব আত্মীয় স্বজন জানে কিনা। আমার এক ঘরে স্বভাবের জন্য অনেকে আমাকে চিনেই না। কিন্তু এক আশ্চর্য কারণে আমার ফুফাত ভাইয়ের স্ত্রী আমাকে অত্যধিক পছন্দ করেন। আমার
এই ছোট্ট জীবনে আমি যে কয়জন মানুষের কাছে অন্তর থেকে কৃতজ্ঞ তার একজন এই মহিলা। স্কুল জীবনে আমার খাতা কলমের সবকিছু উনিই দিয়েছেন। কলেজে উঠার আগ পর্যন্ত আমার পরনের প্রায় কাপড়ই উনার দেওয়া। আমার স্বাস্থ্য খারাপ বলে উনি আমার জন্য হরলিক্স, কেক, বিস্কিট এসব আলাদা করে পাঠাতেন আর বলতেন, খবরদার আর কাউকে দিবি না শুধু তুই খাবি!! আমার হাত ঘড়ি, টেবিল ঘড়ি, এমনকি চায়ের মগটা পর্যন্ত উনি আমার জন্য পাঠাতেন। যতবার উনার সাথে দেখা হয় আমার হাতে পাঁচশো এক হাজার টাকা গুঁজে দেন। আমার কোন পরীক্ষার রেজাল্ট দিলে সবার আগে উনি ফোন করেন। এই লেখাটা হয়ত উনি কোনদিনও দেখতে পাবেন না। কিন্তু আমাদের অভাবের সংসারে উনি আমার খরচের অনেকটাই বহন করেছেন এটার জন্য নয় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে উনি সেই ছোটবেলা থেকে আমার জন্য যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, আমাকে নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন, আমার সাফল্যে আনন্দিত হয়েছেন, ভুল করলে বকা দিয়েছেন এই জন্যই আমি কৃতজ্ঞ। এই মহিলার দিকে আমি কোনদিন চোখ তুলে তাকিয়ে কথা বলিনি। আমার মায়ের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ আমার আছে উনার প্রতি সেটা কোন অংশে কম নয়। কেন?? কারণ কৃতজ্ঞতা! আমার অন্তর তার প্রতি কৃতজ্ঞ। সেই কৃতজ্ঞতা থেকে শ্রদ্ধাবোধ এসেছে, ভালোবাসা এসেছে। মানুষ যখন কৃতজ্ঞ হয় সেই কৃতজ্ঞতা থেকে আরও অনেক সুন্দর কিছু উৎসারিত হয়।
আমার গ্রামে পাড়ার এক বড় চাচি আছেন তার বাড়িতে যদি কোনদিন গরুর মাংশ রান্না হত উনি নিজে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে যেতেন। যতক্ষণ না আমার খাওয়া হয় আমার পাশে বসে থাকতেন। ছোটবেলায় সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কিছুই বুঝিনি। আজ কৃতজ্ঞতা নিয়ে লিখতে বসে উনার কথা মনে পড়ছে। এই মহিলাকে একদিন নিজের টাকায় গরুর মাংস খাওয়ানোর ইচ্ছা। কিংবা আল্লাহ যদি আমাদের দুইজনকে জান্নাতে মিলিয়ে দেন তবে আমার ঘরে উনাকে গরুর মাংসের দাওয়াত দেব। জান্নাতের সেই দাওয়াত নিশ্চয় এই পৃথিবীতে আমার প্রতি উনার নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অসাধারণ প্রতিদান হবে। আমি ঢাকায় এসে যে পরিবারটির ভালোবাসা পেয়েছি সেখান থেকেও স্বতঃস্ফূর্ত কৃতজ্ঞতা আসে। আমার সেই চাচা আমাকে নিজের সন্তানের মত দেখেছেন। ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তির টাকা দিয়েছেন। যখন যে কোন মুহূর্তে, যে কোন বিপদে উনারা আমার পাশে থাকেন। এখন যেমন আছেন। এই যে ফেসবুকে আরাম করে নোট লিখছি, খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমাচ্ছি। আলহামদুলিল্লাহ্। আল্লাহ অনেক মানুষের ভালোবাসা আমাকে দিয়েছেন। সেই ভালোবাসা ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তাই এখন যখন একটু দ্বীন বুঝেছি মহান রবের কাছেই প্রতিদিন দোয়া করি তিনি যেন তাদের উত্তম প্রতিদান দান করেন। আমি সবার কাছেই কৃতজ্ঞ আর সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ মহান আল্লাহ্র কাছে যিনি এই কৃতজ্ঞতার উত্তম প্রতিদান দিতে সক্ষম।
আপনি যে মুসলিম বিশ্বাস করেন মহান আল্লাহ্র অস্তিত্ব। যে বিশ্বাস করেন সবকিছুর ফয়সালাদানকারি মহান আল্লাহ আপনি তাঁর উপর আস্থা রাখবেন, বিপদে ধৈর্যধারণ করবেন। ভালো কিছু না পেলে ধরে নেবেন এর চেয়ে ভালো কিছুর জন্যই আল্লাহ আপনাকে আখিরাতে উপস্থিত করবেন ইনশাআল্লাহ। আপনি এখানে পরীক্ষা দিতে এসেছেন। যার পরীক্ষা যত কঠিন তার পুরস্কারও তত বেশি, তত উত্তম। মহান রবের দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন, আখিরাতের দিকেই আমাদের দৃষ্টি। অনন্ত জান্নাতের আশা বুকে লালন করেই আমাদের বেঁচে থাকা। থাকুক না এপারের অপূর্ণতা, ব্যর্থতা, আক্ষেপ।
চলবে
পর্ব২ঃ